হাওজা নিউজ এজেন্সি: অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ইরানের হাওজা শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান আয়াতুল্লাহ আলী রেজা আরাফি, ইমাম খোমেনি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান আয়াতুল্লাহ মাহমুদ রজবি এবং শিক্ষা বিভাগের উপপ্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মোহাম্মদ রেজা আসাদি। এ ছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা দেওয়া হয়।
মানবিক বিজ্ঞান ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় হাওজার পরিচয়
আয়াতুল্লাহ আরাফি বক্তব্যের শুরুতে ইমাম মাহদি (আ.ফা.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর জন্মবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানান। তিনি আয়াতুল্লাহ মিসবাহ ইয়াজদি (রহ.)-এর বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের প্রশংসা করেন এবং নতুন শিক্ষাবর্ষ উপলক্ষে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের শুভেচ্ছা জানান।
হাওজা শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সামাজিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রণয়ন ও ব্যাখ্যা করা আলেমদের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের একটি।
একটি সমাজের শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি, পরিবার ও নতুন ব্যবসায়িক ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গনে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন। এসব কাঠামো নির্দিষ্ট চিন্তাগত ও তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয় ঐতিহ্য কিংবা বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের চিন্তাধারা থেকে গড়ে উঠতে পারে।
ইসলামি উৎস থেকে সমাজ পরিচালনার কাঠামো প্রণয়ন
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, ইসলামি শাসনব্যবস্থায় সমাজ পরিচালনার নিয়ম ও কাঠামো ইসলামের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, শিয়া ফিকহ বিচারব্যবস্থাসহ কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে কোরআন ও সুন্নাহ থেকে আহরিত বিস্তৃত ফিকহি নীতিমালা এবং গৌণ বিধানের মাধ্যমে সমাজ পরিচালনার বিভিন্ন কাঠামো প্রণয়নের সক্ষমতা ইসলামী ফিকহের রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতি পূরণ করে ইসলামী শাসনব্যবস্থার প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে হাওজা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে।

ফিকহচর্চার পরিধি ব্যক্তিগত বিধানের বাইরে বিস্তৃত করতে হবে
নাজাফে নির্বাসিত অবস্থায় ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর বেলায়াতে ফকিহ তত্ত্ব ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, ইমামের উদ্যোগ জ্ঞানী আলেমদের সামনে গবেষণার নতুন পথ উন্মুক্ত করে দেয়। ইসলামী বিপ্লবের পর এই পথ তাত্ত্বিক ও বাস্তব উভয় ক্ষেত্রেই বিকশিত হয়েছে।
তবে সমাজের কিছু ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে এখনো নানা অসংগতি রয়েছে। তাই ফিকহচর্চাকে কেবল ব্যক্তিগত ও ইবাদতসংক্রান্ত বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। মানবিক বিজ্ঞান ও সামাজিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও হাওজাকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্যই ইমাম খোমেনি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান দিকনির্দেশনা।
বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা-ব্যবস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো সংস্কার
আয়াতুল্লাহ আরাফি মানবিক বিজ্ঞানকে বিশ্ব পরিচালনা ও আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার ‘সফটওয়্যার’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, রেনেসাঁ-পরবর্তী পশ্চিমা বিশ্ব দার্শনিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে মৌলিক বিজ্ঞান থেকে ব্যবহারিক বিজ্ঞান পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক জ্ঞানব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র পরিচালিত হচ্ছে।
তবে এসব অর্জনের পাশাপাশি এই কাঠামোর মৌলিক ভিত্তিতে কিছু ত্রুটি ও ভুল চিন্তার উপাদান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা-ব্যবস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কার করা হাওজার প্রতিভাবান আলেমদের প্রধান দায়িত্ব।
মানবিক বিজ্ঞান সংস্কারে অগ্রগতি হলেও পথ এখনো দীর্ঘ
গত চার দশকে মানবিক বিজ্ঞান সংস্কারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.), আল্লামা তাবাতাবায়ী (রহ.), শহীদ সাদর এবং আল্লামা মিসবাহ (রহ.)-এর চিন্তাধারার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি বিভিন্ন মহল থেকে বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি দায়িত্বশীল পর্যায়েও বাধা এসেছে।
তিনি বলেন, অর্জন সত্ত্বেও এখনো অনেক পথ বাকি। তাই জিহাদি মানসিকতা নিয়ে এই কার্যক্রমকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্ঞানগত পরিবর্তন
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ঘটনাবলি এবং আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিভিন্ন সংঘাতে অনেক সাদৃশ্য দেখা গেছে। এর মধ্যে ১২ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ও রমজান যুদ্ধের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলার ভয় কমে যাওয়া। তিনি এটিকে ইসলামী বিপ্লবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন।
প্রতিরোধ আন্দোলনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের হারানোকে তিনি বড় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এসব সংগ্রাম পশ্চিমা বিশ্বের কেন্দ্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে একটি মৌলিক সভ্যতাগত সংঘাতের দিক নির্দেশ করে।
তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বের বৈজ্ঞানিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি বিশ্ব পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হলেও আজ সেই কাঠামো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক পর্যায়ে জ্ঞানগত সমীকরণ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে চিন্তাগত অবকাঠামো নির্মাণ
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সামরিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনের আগে চিন্তাগত অবকাঠামোর পরিবর্তন জরুরি।
প্রকৃত দর্শন ও ফিকহের ভিত্তিতে নতুন জ্ঞানগত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই কাঠামো কোরআন ও সুন্নাহ থেকে আহরণ করে মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, ইসলামী বিপ্লবের আগে বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক আলোচনা তাত্ত্বিক পর্যায়ে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু ইসলামী শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে এখন এসব তত্ত্ব বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মৌলিক তাত্ত্বিক গবেষণাকে সুসংগঠিত করার আহ্বান
নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাফল্য কামনা করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, মৌলিক তাত্ত্বিক গবেষণাকে সুসংগঠিত করে সমাজের বাস্তব প্রয়োজনের উত্তর দিতে হবে।
মুসলমানদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি চিন্তাগত ভিত্তি যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ামক না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মনোযোগ এবং জ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা ও প্রচার অপরিহার্য।

আপনার কমেন্ট